এভারেস্টে প্রথম মহিলা
এভারেস্ট বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বিন্দু যার মাথায় পা দিয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছে কম বেশী আমাদের সবারই থাকে। কিন্তু সেই সৌভাগ্য খুব কম জনেরই হয়। আজকে যার কথা বলবো তিনি আবার এভারেস্টে প্রথম আরোহন করা মহিলা। আমরা সবাই জানি এভারেস্টে প্রথম পা রেখেছিলেন নিউজিল্যান্ড দেশের নিবাসী স্যার এডমন্ড হিলারি এবং সঙ্গে ছিলেন নেপাল দেশের শেরপা তেনজিং নোরগে। এভারেস্টের সাথে এই দুই নামও অমর হয়ে রয়ে গেছে। ১৯০০ সালের পর থেকেই বিভিন্ন দেশ চাইছিলো এভারেস্ট জয়ের মুকুট মাথায় পরতে।সবাই সেইমতো চেষ্টাও চালাচ্ছিলো ,কিন্তু সাফল্য কারোর কাছেই ধরা দিচ্ছিলো না। খুব অল্পের জন্য ব্রিটিশরা এই মুকুট হাতছাড়া করে। ব্রিটিশ অভিযাত্রী জর্জ ম্যালোরি এভারেস্টের ৪নম্বর ক্যাম্পের কাছে নিখোঁজ হয়ে যান, সালটা ছিলো ৮ জুন ১৯২৪।
![]() |
| জর্জ ম্যালোরি /সূত্র -গুগল |
অনেকটাই কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন ম্যালোরি, কিন্তু এভারেস্ট জয়ের টিকা মাথায় পরতে পারলেন না। ম্যালোরি এভারেস্টের উত্তর দিক মানে চীনের দিক দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ৭৫ বছর পর ১৯৯৯ সালের ১লা মে নাগাদ তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়।
![]() |
| ম্যালোরির মরদেহ /সূত্র -গুগল |
![]() |
| তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি /সূত্র -গুগল |
এরপর আরও অনেক অভিযান হয় এভারেস্টকে ঘিরে ,কিন্তু এই অভিযান পর্বে না গিয়ে বরং দেখি এইসময় মেয়েরা এভারেস্টকে ঘিরে কেমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এইসময় মাউন্টেনেরিং যে একধরণের খুব কঠিন স্পোর্টস তা সবার কাছে পরিচিতি পাচ্ছিলো, সব দেশের মধ্যে এভারেস্ট খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো ,সবাই যে যার নিজের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছিলো এভারেস্ট আরোহনের জন্য। জাপানও এ ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে থাকে নি। ১৯৭০ সাল নাগাদ তারা প্রথম এভারেস্ট যাত্রা করে কিন্তু খুম্বু আইসফল থেকে প্রচুর বরফের স্খলন সেই অভিযান শেষ করে দেয় সঙ্গে বহু অভিযাত্রীর মৃত্যু হয়। ১৯৭৩ সাল নাগাদ তারা আবার এভারেস্ট অভিযান করে এবং ১৯৭৫ সাল নাগাদ প্রথম জাপান একটি মহিলা অভিযাত্রী দল এভারেস্ট আরোহনের জন্য পাঠায় এবং এই বছরেই পৃথিবীর সর্ব প্রথম মহিলা হিসেবে জুনকো তাবেই এভারেস্টের শৃঙ্গে পা রাখেন ।
১৯ মে,১৯৭০ সাল , তাবেই এবং তাঁর সহযাত্রী সফল ভাবে অন্নপূর্ণা ৩ আরোহন করে ফেলেছেন। তাবেইএর তৈরী LCC লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে যে এইবার এভারেস্টে উঠতেই হবে, যাই হয়ে যাক না কেন। ১৫ জনের একটা দল তৈরী করলেন তাবেই, সঙ্গী অভিযাত্রীরা বেশিরভাগ শিক্ষক ,অ্যাডভোকেট ,কাউন্সিলর ,তবে পুরো টিমে একটাও ছেলে অভিযাত্রী তিনি রাখলেন না। তিনি হয়তো জানতেন এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় খালি এই ১৫ জন মহিলার জয় হবে না ,হবে গোটা পৃথিবীর সমস্ত মহিলার জয়। খুব কঠিন ট্রেনিং পর্ব শেষ করে ১৫ জন মহিলা বেরিয়ে পড়লেন এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে । কাঠমান্ডু পোঁছে তাঁরা সেই এক পথ ধরলেন যেই পথে এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নরগেরা এভারেস্ট জয় করেছিলেন। কিন্তু হায় দুর্ভাগ্য পদে পদে খালি পরীক্ষা নেয় ,যখন তাঁরা ৬৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প লাগাতে ব্যাস্ত ঠিক সেই সময় বিরাট বড়ো ধরণের বরফের স্খলন সমস্ত কিছু নিঃশেষ করে দেয়। এই ধরণের উচ্চতায় বরফের স্খলন মানে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি ,বাঁচার সম্ভবনা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। হলোও তাই, মোটা বরফের চাদর তাদের ওপর দিয়ে চলে গেলো ,মুহুর্তের মধ্যে সবকিছু অন্ধকার। কে বেঁচে রইলো আর কে নেই,তাও ঠাওর করা যাচ্ছিলো না।
"বরফের স্খলন ,মৃত্যুর কাছাকাছি"/সূত্র -ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল
তাবেই নিজেও ৬ মিনিট অব্দি অচেতন অবস্থায় ছিলেন ,চেতন ফেরে যখন তার শেরপা তাকে বরফ খুঁড়ে বের করে। বড্ড অসহায় লাগছিলো তাবেই এর ,মনে পড়ে যাচ্ছিলো সেইসব পুরোনো দিনের কথাগুলো-অভিযানের জন্য কি কষ্টটাই না তাদের করতে হয়েছে। মনে পরে যাচ্ছিলো স্লিপিং ব্যাগ তারা বানিয়েছিলো হাঁসের পালক দিয়ে যাতে খরচা কম হয়। কি কষ্ট করে তাদের স্পনসরশিপ জোগাড় করতে হয়েছে ,কতলোক ফিরিয়েছে ,আবার ছোট ছোট সাহায্যের হাতও এগিয়ে এসেছে। এভারেস্টের -৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রা থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা কোনো আধুনিক সরঞ্জাম কিনতে পারেনি ,ব্যাবহৃত গাড়ির সিট্ ,মোটা পলিথিন ব্যবহার করেছে জ্যাকেট ও গ্লাভস তৈরীর জন্য। স্কুলের ছেলেরা অভিযানের সাফল্য কামনা করে তাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলো অব্যাবহৃত জ্যামের প্যাকেট।
বরফের মোটা চাদরে অনেকে চিরনিদ্রা নিলেন অনেকে গুরুতর জখম ,ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয়ে নিচে নেমে গেলেন। নাছোড়বান্দা তাবেই হার মানলেন না ,বরফ স্খলনের ১২ দিন পর ১৬ই মার্চ ,১৯৭৫ সঙ্গী শেরপা আং তেশেরিং এর সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বিন্দুটিতে পা রাখলেন। হয়ে গেলেন পৃথিবীর প্রথম মহিলা যিনি সর্বপ্রথম এভারেস্টে পা রাখলেন। চারিদিকে দ্রুত খবর টা ছড়িয়ে গেলো ,সার্থক হলো এতদিনের কষ্ট,প্রতিজ্ঞা আর স্বপ্ন। যারা একদিন কেবল মেয়ে বলে তাকে কোনো অভিযানের অংশ করেনি ,সেই মেয়ে আজ ইতিহাস তৈরী করলো। আসলে এভারেস্টের থেকে k ২ বা অন্নপূর্ণা অনেক কঠিন, চড়াইয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু এভারেস্ট মানুষকে খ্যাতি দেয় ,আনন্দ দেয় ,কারণ তখন আপনি সব শৃঙ্গের ওপরে আর সব আপনার নিচে। এভারেস্ট আরোহনের ঠিক পর পরই নেপালের রাজার কাছ থেকে তাবেই শুভেচ্ছাপত্র পান, জাপান সরকার তার এই অভিযান নিয়ে ছোট ডকুমেন্টরি ও তৈরী করে।
"পথ চলা "/সূত্র -গুগল
"the seven summit "
তাবেই এখানেই থেমে থাকেন নি, এরপর ১৯৯২এর মধ্যে তিনি সেভেন সামিট কমপ্লিট করেন। সেভেন সামিট হলো সাত মহাদেশের সাত উচ্চতম শৃঙ্গ। সব শৃঙ্গগুলোতেই তিনি বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। একবার দেখে নেয়া যাক সেই সাত শৃঙ্গের নাম --
- everest ---asia(৮,৮৪৮)
- aconcagua---south america(৬,৯৬২)
- denali---north america( ৬,১৯৪)
- kilimanjaro---africa(৫,৮৯৫)
- elbrus-----europe(৫,৬৪২)
- punakjaya---australia(৫,৮৮৪)
- vinson massif ---antartika(৪,৮৯২)
অভিযানে যাওয়া ছাড়াও তাবেই নিজেকে আরও অন্য কাজের সাথে যুক্ত রেখেছিলেন। তিনি ইকোলজি নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্ৰী করেছিলেন ,লক্ষ্য ছিলো এভারেস্টের পরিবেশ দিনে দিনে কেন খারাপ হচ্ছে সেই ব্যাপারে। তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এভারেস্টের পরিবেশ খারাপ হওয়ার জন্য মূল কারণ অভিযাত্রীদের ফেলে আসা বজ্ৰ পদার্থ। তিনি মনে করতেন অভিযাত্রীদের এবং নেপাল সরকারকে এই ব্যাপারে আরও সচেতন হতে হবে। তাবেই ডিরেক্টর ছিলেন জাপানের হিমালয়ান এডভেঞ্চার ট্রাস্টের। তিনি জাপান এবং হিমালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আরোহনের আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। অবশেষে এই দীর্ঘ যাত্রার অবসান হয় ২০ অক্টোবর ২০১৬। জুনকো তাবেই রইলেন না তবে যতদিন এভারেস্ট থাকবে ,যতদিন এভারেস্ট আরোহন হবে ততদিন জুনকো তাবেই এভারেস্টে অমর হয়ে থেকে যাবে। তার একটি উক্তি এখানে শেষে উল্লেখ করছি ---
"Technique and ability alone do not get you to the top ;it is the willpower that is the most important. This willpower you cannot buy with money or be given by others...it rises from your heart "
পুরুষশোষিত সমাজের ওপরও তাবেইর ক্ষোভ ফুটে উঠেছে ----
"সফল যাত্রা "/সূত্র-গুগল
এখানে আমিও এই সুদীর্ঘ লেখার অবসান ঘটালাম ,আশা রাখি আমার জন্য না পড়লেও চলবে,কিন্তু অবশ্যই জুনকো তবেই র জন্য এই লেখা পড়া উচিত। আমরা প্রত্যেকদিন গুগলে কতকিছু সার্চ করি ,ব্যাতিক্রম আমিও নই ,গুগল আজ ডুডলে জুনকো তাবেইর ৮০তম জন্মদিনের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে।সেই পড়া শুরু ,এরপর আর থামা নেই ,পড়ার পর ভাবলাম এটা সবার সাথে শেয়ার করা দরকার। আবার অন্য লেখা অন্য কোনো দিন।
তথ্য সূত্র --
১. গুগল উইকি
২. এভারেস্ট --দেবাশিষ বিশ্বাস
৩. গুগল ডুডল
চিত্র কৃতজ্ঞতা ---
গুগল
"খেল খতম "










Comments
Post a Comment