বাঁকুড়া এক্সপ্রেস :দ্বিতীয় পর্ব : মুকুটমণিপুর
মুকুটমণিপুর কে অনেকে কংসাবতী ব্যারাজ বলেও চেনে। অর্থাৎ কাঁসাই নদীতে বাঁধ দিয়ে যেখানে জল ধরে রাখা হয়েছে সেটাই মুকুটমণিপুর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া জেলাতে দর্শনীয় স্থান বলে যদি গুগলে খোঁজা হয় তবে মুকুটমণিপুরের নাম উঠে আসবে অবশ্যই। একদিন বা দুদিনের জন্য এই স্থান কাছে পিঠের মধ্যে আদর্শ এক জায়গা। সব মরশুমেই লোকজনের আনাগোনা থাকে এখানে তবে শীতকালে লোকজন যেন উপচে পড়ে মুকুটমণিপুরে। বিশেষতঃ ২৫ শে ডিসেম্বর ও ১লা জানুয়ারীর দিনে এখানে দাঁড়াবার পর্যন্ত জায়গা থাকে না। আমরাও শীতকালে ভুলে যাওয়া কোনো এক তারিখে মুকুটমণিপুর গিয়েছিলাম বন্ধু সরোজের সাথে বাঁকুড়া শহর থেকে। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বহুবার এই জায়গায় এসেছি নানাভাবে। লোকজন বেশিরভাগ নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যেতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে তবে লোকাল পরিবহন ব্যবহার করেও এখানে আসা যায়। বাঁকুড়া ভ্রমণের তিন নম্বর জায়গা হিসেবে আমরা মুকুটমণিপুর স্থির করেছিলাম।
মুকুটমণিপুর বাঁকুড়া জেলার খাতড়া ডিভিশনে পড়ে। কংসাবতী নদী বা কাঁসাই নদী ছোটোনাগপুরের মালভূমি থেকে সৃষ্টি হয়ে পুরুলিয়া ,বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। বাঁকুড়া জেলার মুকুটমণিপুরে বাঁধ দিয়ে এই নদীর প্রবাহকে ধরে রাখা হয়েছে। এবং সেটাই লোকজন অনেক অনেক দূর থেকে দেখতে আসে। শুধু কি এটাই আছে এখানে ? না!! আরো কিছুও আছে?
আমরা জানি কিনা জানি না ? মুকুটমণিপুর ড্যাম হলো ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাটি দিয়ে তৈরী বাঁধ। বাঁধের ওপরে যে রাস্তা তৈরী করা রয়েছে তা ১১km দীর্ঘ। এই দীর্ঘ রাস্তার মাঝে একটা ছোট পাহাড় রয়েছে যাকে পরেশনাথ পাহাড়ও বলে। এই পাহাড়ে অনেক জৈন ও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে যেগুলি বাঁধ তৈরীর সময় পাওয়া গিয়েছিলো। মূর্তিগুলি খোলা অবস্থাতেই পূজো করা হয়। এর ঠিক পাশেই একটা সুন্দর পার্ক তৈরী করা হয়েছে ,যেখানে বিকেলে বসে বসে চা খেতে খেতে সামনের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে মন্দ লাগবে না। তবে এখানে যেতে ভুটভুটিই (এক ধরণের অটো ) ভরসা। এগুলি শেয়ারে যায় ,তাই যাওয়া এবং আসা দুটোর টিকিটই আগে থেকে কেটে রাখুন। এই অটোগুলি গভরমেন্ট নিবাসের কিছুটা সামনেই পেয়ে যাবেন। অটোতে যেতে না চাইলে সাজানো নৌকা গুলোতেও যেতে পারেন। নৌকাগুলো ইঞ্জিনে চলে ,তাই স্বচ্ছ সবুজ জলে হাত ডুবিয়ে যেতে মন্দ লাগবে না। এটাও প্যাকেজ ট্যুর হয়। মন্দিরের সাথে একটা হরিণ দ্বীপ ও এরা দেখায়। প্যাকেজ অনুযায়ী দাম নির্ভর করবে।
যেখানে মূল লকগেট রয়েছে মানে একেবারে প্রথমদিকে , সেখানেও আপনি ঘুরে বেড়াতে পারেন। যদি পাহাড় চড়তে পটু হন তবে লকগেটের অপরপ্রান্তে যে প্রান্তে জল নেই সেখানে নামতে পারেন। ছোট ছোট ঝর্ণা পেয়ে যাবেন। অনেকে এখানেই স্নান সেরে নেয়। অনেক অচেনা রাস্তা বিভিন্ন টিলার দিকে উঠে গেছে ,রোমাঞ্চ চাইলে এটাও চেষ্টা করতে পারেন। সবচেয়ে ভালো বাঁধের ওপরের রাস্তা দিয়ে যতটা সম্ভব ডানদিকে নদীকে রেখে সামনে হেঁটে চলা। কিছদুর হেঁটে চলার পরে বামদিকে অনেক ছোট ছোট আদিবাসীদের গ্রাম দেখতে পারবেন। দেখতে পারবেন অনেকে বাঁধের জলে মাছ ধরছে ছোট ছোট নৌকাতে। আমরা এই রাস্তা ধরে সোজা মন্দির পর্যন্ত হেটেছিলাম। ফেরার সময় নৌকাতে ফিরেছিলাম।
যদি হাঁটতেও ভালো না লাগে তবে সামনে বিশাল সবুজ নদীকে সাক্ষী রেখে বসে পড়ুন দেখবেন মন ভালো হয়ে যাবে। থাকার জায়গা বলতে সরকারী নিবাসটাই চোখে পড়েছিলো ,এখন অন্য কিছু হয়েছে কিনা জানা নেই। সরকারী নিবাসের জন্য বোধহয় আগে থেকে বুকিং থাকতে হয়। সাধারণত লোকজন একদিনের জন্যই যায় মুকুটমণিপুর। নাহলে আপনাকে খাতড়াতে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে খাবার দোকান সেরকম ভালো নেই ,তাই আগে ভাগে ব্যবস্থা করে যান। লোকজন এখানে মূলত পিকনিক করতে আসে তাই খাবার দাবার তারা সাথেই আনে।
যাবেন কিভাবে ? কলকাতা থেকে ট্রেনে করে বাঁকুড়া স্টেশন। বাঁকুড়া বাস স্টেশন থেকে বহু বাস খাতড়া যায়। খাতড়া থেকে মুকুটমণিপুর যাওয়ার বাস বা ট্রেকার পেয়ে যাবেন। ফেরার সময় মুকুটমণিপুর থেকে বাঁকুড়া বা বিষ্ণুপুর যাওয়ার বহু বাস পেয়ে যাবেন।
মনে রাখবেন ---
১) পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও জল নিয়ে যান।
২) যেখানেই খাবার পাবেন সেখানেই খেয়ে নিন ,কারণ পরে খাবার নাও পেতে পারেন যদি একা যান।
৩) স্থানীয় লোকেদের সম্মান দিয়ে কথা বলুন ,বিশেষত ওখানকার ভাষা কলকাতার মতো নয় , তাই হাসাহাসি করবেন না।
৪) নৌকা বা অটো প্যাকেজ নেওয়ার আগে দরদাম করে নেবেন।
৫) বাঁধের জলে স্নান করতে নেমে যাবেন না ,জল কিন্তু খুব গভীর এখানে।
৬) নৌকাতে যাওয়ার সময় লাইফ জ্যাকেট পরে নেবেন ,এবং হুমড়ি খেয়ে জলের ওপরে ঝুঁকে পড়বেন না।
৭) পরেশনাথ পাহাড়ে সেলফি তোলার সময় সতর্ক থাকুন।
৮) ছাতা এবং ওষুধপত্র নিয়ে নেবেন।
৯) স্থানীয় প্রশাসনের ফোন নম্বর জোগাড় করে রাখুন।
১০) মদ্যপান ও ধূমপান নিষিদ্ধ।
শীতকাল সবচেয়ে আদর্শ মুকুটমণিপুর যাওয়ার জন্য।
যেহেতু এটা ফটোর অ্যালবাম তাই কথা আর বাড়ালাম না।
"মূল লকগেট --মুকুটমণিপুর "
" লকগেটের অপরপ্রান্ত যেখানে হেঁটে নেমে যেতে পারেন "
" সরকারী নিবাস --মুকুটমণিপুর "
" জলের মাঝে একাকী -মুকুটমণিপুর ড্যাম "
"সবুজ নীল জল ,দূরে দেখা যায় পাহাড় "
" সুদীর্ঘ ১১ km রাস্তা চলে গেছে মন্দির অব্দি, ডানদিকে নীল জল "
" সাদা কালো ড্যাম এবং নৌকা বিহার "
" এখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় "
" ভ্রমণ সঙ্গী ফোনে ব্যাস্ত "
"পরেশনাথ পাহাড়ের ওপর থেকে তোলা "









































Comments
Post a Comment