ভ্রমণের অ আ -ক খ
শরৎ কালের সাদা নীল আকাশে যখন কেউ রং তুলি টেনে দিয়ে যায় ,তখন অবাক করে জানালার পুবদিকে অগোছালো ঘাসের স্তূপের মধ্যে সাদা রঙের কাশফুলকে ডানা মেলতে দেখা যায়। মানে মা আসছেন এইবার। এই মা সবার মা ,বড় আপন আমাদের। বন্ধ গাড়ির কাঁচে অনবরত ধাক্কা দিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের বিরক্তিকর বেলুন বিক্রি আজ আর খারাপ লাগছে না। দশ মাস ধরে অপেক্ষা করে থাকা, চুলে আলতো পাক ধরা মায়েদের আজ আর মন খারাপ করছে না ,ছেলে আসছে যে পূজোতে। বসের দুটো অতিরিক্ত দেওয়া কাজও আজ যেন খারাপ লাগছে না ,লাগছে না বাসে বারে বারে ঢুলে পড়া কাকুর মাথার ধাক্কা , মা আসছে যে। এই মা আসার সাথে সাথেই যেন ,মানুষের মধ্যে ঘোরার অদম্য ইচ্ছেটাও চলে আসে। সুনীতা চার মাস আগে থেকে হোটেল বুকিং করে রেখেছে শিলংএর ,এই পূজোতে শিলংএ শেষের কবিতার ফিল টা হলে মন্দ হয় না। আশুতোষ যেতে চায় ইজিপ্ট ,তুতেনখামেনের রহস্যটা ভেদ করতে হবে যে। আবার কেউ কেউ দেখা হয় নাই একটি শিশির বিন্দুর মতো ইটাচুনা রাজবাড়ীর রাজকীয় খাবারের স্বাদ নিতেও ভুলেন না। মোদ্দা কথা সেই ঘুরে ফিরে ভ্রমণ। খালি জায়গাগুলো বদলে যাচ্ছে। আচ্ছা আমরা সবাই কম বেশি ভ্রমণ করতে ভালোবাসি,আমরা কি জানি এই ভ্রমণ ব্যাপার ঠিক কোথা থেকে এলো। চলুন কথা না বাড়িয়ে একটু দেখে নি ------
ভ্রমণকে ইংরেজিতে আমরা "TRAVEL " বলতে পারি ,যার অর্থ কোনো ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে নড়াচড়া বা ঘোরা। এই ঘোরা বা নড়াচড়া ব্যাপারটা নানাভাবে হতে পারে ,যেমন পায়ে হেটে বা গাড়ীতে করে ,সাইকেলে বা ট্রেনে। ভ্রমণে দুটো জায়গার মধ্যে ঘোরা-ফেরার সাথে সেখানে অল্প সময় থাকাটাও যুক্ত হয়। "TRAVEL " কথাটি ওল্ড ফ্রেঞ্চ ট্রাভিল {" TRAVAIL"} থেকে এসেছে যার অর্থ কাজ বা "work ". ১৪ সেঞ্চুরি তে প্রথম ট্রাভেল কথাটির ব্যবহার হয় বলে জানা যায়।
![]() |
| "গ্রেট ওয়াল অফ চাইনা -সেভেন ওয়ান্ডার্স"
সিমন উইনচেস্টার একজন ভ্রমণবিদের মতে প্রাচীনকালে ভ্রমণ খুব কষ্টদায়ক ছিল সেইজন্য travail এর সারমর্ম হলো struggle .তবে আজকে ভ্রমণ কঠিন বা সহজ নির্ভর করে যিনি ঘুরছেন তার ওপর। মানে তিনি মাউন্ট এভারেস্ট যাচ্ছেন না পাতি অযোধ্যা পাহাড়। প্রাচীনকালে ট্রেন বা উড়োজাহাজ কিছুই ছিল না ,যা ছিল তা খুব একটা আরামপ্রদ ছিল না।
ভ্রমণের পেছনে কি কি উদেশ্য থাকতে পারে ? মনে করা হয় মানুষ সাধারণত যে যে উদেশ্যকে সামনে রেখে ভ্রমণ করে সেগুলো হলো ---
১) আনন্দ প্রাপ্তি ।
২) মনের ও শরীরের আরাম প্রাপ্তি।
৩) নতুন কিছু আবিষ্কার বা খোঁজা।
৪) সংস্কৃতির আদান প্রদান।
৫) সম্পর্ক স্থাপন করা। ইত্যাদি ইত্যাদি।
"খ্রীষ্ট দা রেডিমের স্ট্যাচু -রিও দে জেনেরিও --সেভেন ওয়ান্ডার্স "
প্রাচীনকালে গ্রীক এবং রোমানরা ভ্রমণ করতো অবসর সময় কাটানোর জন্য। গরমকালে তারা পম্পেলি বা বাইসে চলে যেত ,সেখানে কোনো ভিলাতে তারা আনন্দ ফুর্তি এবং অবসর সময় মজা করে কাটাতো। প্রাচীনকালে ভ্রমণে অনেক বেশি সময় লাগতো ,এবং সেই ভ্রমণ যথেষ্ট বিপদের ছিল। কারণ তখন ভ্রমণে ঘোরার উদ্দেশ্যর থেকে বাণিজ্য অনেকবেশি গুরুত্ব পেতো। কিন্তু দিনে দিনে টেকনোলজি অনেক বেশি উন্নত হওয়ার কারণে ভ্রমণ অনেক সহজ থেকে সহজতর হয়েছে। যেমন ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সাল নাগাদ স্পেন থেকে নতুন দেশ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ১০ সপ্তাহ পরে তিনি তার কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছন এবং আমেরিকা দেশ আবিষ্কার করেন। যদি আজকে কেউ স্পেন থেকে আমেরিকা যাত্রা করে তবে একরাতের মধ্যেই বিমানে করে পৌঁছনো যেতে পারে। ব্যবসা -বাণিজ্যের স্বার্থে তখন মানুষ নানাভাবে একজায়গা থেকে আরেক জায়গা যাত্রা করতো। এইসময় ক্যারাভান বলে একধরণের সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয় যারা বাণিজ্যের তাগিদে একসঙ্গে যাত্রা করতো। সাধারণত এরা মরু পথে যাত্রা করতো। এরা পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের যোগাযোগ স্থাপন করে।
ক্যারাভান সম্প্রদায়
"পেদলের "পেডলার বলে একদল মানুষ এই সময় দেখা দিতে থাকে। ইংল্যান্ডে এই পেডলার দের রমরমা দেখা দেয়। এরা ঘুরে ঘুরে যারা বাইরে থেকে বেড়াতে আসে তাদের নানান দ্রব্য বিক্রি করে। এরা গ্রাম বা শহর দু জায়াগাতেই ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করতো।
এছাড়াও gyrovagues বা ট্রাভেলিং মিনিস্টার দের দেখতে পাওয়া যেত ,যারা উদ্দেশ্যহীনভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা ঘুরে বেড়াতো ,কোনো ঘরবাড়ি এদের ছিলো না ,যেখানে যেত সেটাই তখনকার মতো তাদের ঘর -বাড়ি হয়ে যেত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যারা ভ্রমণ করছে তারা কেবল সেই জায়গা দেখার জন্য ভ্রমণ করছে না ,করছে পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকার কারণে। ইউরোপ এবং ইসলামিক দেশগুলোতে পিলগ্রিমেজেসদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছিলো। ১৬ শতাব্দীর শেষের দিকে ভ্রমণ ইউরোপীয়ান অভিজাতদের কাছে একটা ফ্যাশন হয়ে উঠেছিল। তারা পড়াশোনা এবং সাহিত্যের তাগিদে গোটা ইউরোপের বিভিন্ন শহর ঘোরা শুরু করে ফেলেছিলো।
"মাচু পিচু -পেরু -সেভেন ওয়ান্ডার্স "
এই ভ্রমণ ইউরোপীয়দের কাছে গ্রান্ড ট্যুর বলেও বিখ্যাত ছিলো। এই ইউরোপীয় অভিজাতরা লন্ডন ,প্যারিস ,রোম এর মতো শহরে এই গ্রান্ড ট্যুর করতো। যদিও ফরাসি বিপ্লব এই গ্রান্ড ট্যুরের অবসান ঘটিয়েছিলো । স্থলপথে ভ্রমণের থেকে জলপথ অনেকবেশি আরামদায়ক ছিল সেই সময় ,যতক্ষণ না ১৯ শতকে রেলপথ আবিষ্কৃত হচ্ছে। ১৯ শতকের সময় থেকে ভ্রমণের উদ্দেশ্য পাল্টে যেতে শুরু করে বিশাল আকার ভাবে। ফলস্বরূপ ভ্রমণের কষ্ট লাঘব হয় এবং মানুষজন ভ্রমণকে মজার অংশ হিসেবে দেখতে থাকে।
"রোমান কলোসিয়াম "---সেভেন ওয়ান্ডার্স
এই সময় নানা ভ্রমণ সংস্থা খুলতে শুরু হয়। ভ্রমণ বা ট্যুরিজমে বিনিয়োগের দরজা খুলে যায়। বহু মানুষ পেশা হিসেবে ভ্রমণকে গ্রহণ করে। থমাস কক নামক এক বিখ্যাত সংস্থা ঠিক এই সময়েই তৈরী হয়েছিল। যা কিছুদিন আগে অপ্রত্যাশিত ভাবে বন্ধ হয়ে যায় আর্থিক মন্দার কারণ দেখিয়ে। মনে করা যেতেই পারে আধুনিক বিশ্ব প্যাকেজ ট্যুর ছেড়ে অনেক বেশিভাবে ব্যাক্তিগত ট্যুরের দিকে ঝুকে পড়ছে। তবে তা সময়ই বলবে।
"তাজমহল -আগ্রা -সেভেন ওয়ান্ডার্স "
২০ শতকে এয়ারপ্লেন এসে যাওয়ার ফলে বিশ্বর সব অংশের সাথে ভ্রমণের দরজা খুলে যায়। বিশেষত দূরত্ব সম্পন্ন ভ্রমণ দেশগুলির ক্ষেত্রে। বর্তমানে ছোট ছোট দূরত্ব সম্পন্ন জায়গাগুলি যেতেও মানুষজন এরোপ্লেনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। ভ্রমন এখন অনেক সহজ এবং নিরাপদ। ভ্রমণকে ভূতাত্বিক ভাগ হিসেবে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে -
১) আঞ্চলিক
২) দেশীয়
৩) আন্তর্জাতিক
আঞ্চলিক এবং দেশীয় ভ্রমণ ভারতের মতো দেশে প্রচুর ভাবে দেখা যায় ,যদিও প্রথম বিশ্বর দেশগুলিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। যার অন্যতম কারণ অর্থ। যদিও হালে বহু মানুষ ভারতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা ভিসা থাকা জরুরী। তবে তৃতীয় বিশ্বর দেশগুলিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে ইউরোপের দেশগুলিতে মানুষের যাওয়ার পরিমান অনেক কম যতটা না এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিতে। তার প্রধান এবং প্রথম কারণ অর্থের সংস্থান।
"পিরামিড অফ চিচেন ইত্জা ---সেভেন ওয়ান্ডার্স "
বর্তমানে ভ্রমণ নিরাপত্তা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। ভালোভাবে গিয়ে নিরাপদে ফিরে আসতে কম বেশি সকলেই চায়। নিরাপত্তা নির্ভর করে আপনি কোথায় যাচ্ছেন এবং সেখানে গিয়ে সেখানকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি নিয়ম মানছেন কিনা তার ওপর। নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি দেশ এবং বিদেশ উভয় জায়গাতে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। কিছু কমন জিনিস আছে ভ্রমণের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেগুলো না হয় পরে আলোচনা করা যাবে। তবে একটা কথা বলাই যায় ,যেখানে যাচ্ছেন সেই জায়গা নিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা সকলেরই করা উচিত। কোন সময়ে কোন জায়গায় যাওয়া উচিত তাও পড়াশোনা করে নেওয়া ভালো।
ট্রাভেল ও ট্যুরিজম :
ট্রাভেল এবং ট্যুরিজমের দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে ,দেখা নেওয়া যাক কি পার্থক্য ---
১) ট্রাভেল হলো কোনো এক জায়গায় যাত্রা অনেকদিনের জন্য। ট্যুরিজম হলো কোনো এক জায়গায় গিয়ে সেখানে কিছু করা আমোদ প্রমোদের জন্য।
২) মানুষ বিভিন্ন কারণে ভ্রমণ বা ট্রাভেল করতে পারে। যেমন -বাণিজ্য ,আমোদ-প্রমোদ ,পড়াশোনা। কিন্তু ট্যুরিজম হলো আমোদ -প্রমোদের জন্য যাত্রা করা।
৩) ট্রাভেলের ক্ষেত্রে মানুষ অনেকদিনের জন্য কোনো এক জায়গায় থাকতে পারে তার উদ্দেশ্যর ওপর। কিন্তু ট্যুরিজমে মানুষ কখনই এক জায়গায় অনেকদিন থাকে না।
৪) ট্রাভেল একটা মূল শব্দ যা আমরা প্রত্যেকদিনের জীবনে ব্যবহার করে থাকি কিন্তু ট্যুরিজম শব্দটি ব্যবহার হয় অনেকটা বাণিজ্যিক ভাবে, ছুটি কাটানো বা নতুন জায়গা ভ্রমণের জন্য।
তাই এই ট্যুরিজম নিয়ে পরে কোনো একদিন বিশদে আলোচনা করা যেতে পারে। এবার দেখে নেওয়া যাক কিছু ইংরেজি টার্ম যা ট্রাভেল এবং ট্যুরিজম এর সাথে ব্যাবহৃত হয়-- ১) RESFEBER : অর্থ এক অজানা আনন্দ বা উত্তেজনা ভ্রমণ শুরুর আগে একজন ভ্রমকারীর মনে। উৎপত্তি SWEDISH . ২) SOLIVAGANT: অর্থ একজন যে কিনা একা গোটা বিশ্ব ভ্রমণ করতে ভালোবাসে। উৎপত্তি ল্যাটিন। ৩) FERNWEH : অর্থ দূরের কোনো প্রিয় জায়গায় যাওয়ার তীব্র বাসনা। উৎপত্তি জার্মান। ৪) SEHNSUCHIT: অর্থ চিন্তা বা আকাঙ্খা বা ব্যাকুলতা হৃদয়ে অতীতে ঘুরে আসা জায়গাগুলোর প্রতি বা ভবিষ্যতে ঘটবে বা যাওয়া হবে এমন জায়গার প্রতি। উৎপত্তি জার্মান। ৫) COCKAIGNE: অর্থ স্বপ্নের এক জায়গা যেখানে খালি আমোদ আর অলসতা আছে। উৎপত্তি মিডল ফ্রেঞ্চ। ৬) DERIVE: অর্থ এক হঠাৎ এবং কোনো প্ল্যান ছাড়া যাত্রা , যেখানে যিনি এটা করছেন তিনি প্রকৃতি এবং সেখানকার ভাস্কর্য দেখে প্রভাবিত হন। উৎপত্তি ফ্রেঞ্চ। ৭) VAGARY: অর্থ অদ্ভুত কল্পনাপূর্ণ ভাবে কোথাও ঘোরা ,উৎপত্তি ল্যাটিন। ৮) STURMFREI : অর্থ স্বাধীনতা একা থাকার এবং যা তুমি করতে চাও তা করতে পারা। উৎপত্তি জার্মান। ৯) EUDAIMONIA : মনের এক খুশি অবস্থা যখন ভ্রমণের সময়। এই সময় সব কিছুই ভালো লাগে। উৎপত্তি গ্রিক। ১০) CODDIWOMPLE: অর্থ কোনো এক অজানা জায়গায় ভ্রমণের উদ্যেশে যাওয়া। উৎপত্তি ইংলিশ স্ল্যাং।
আর লেখা অযথা বাড়াবো না। অনেক বেশি হয়তো বলা হয়ে গেলো। লেখাতে কিছু ভুল থাকলে সংশোধন করে দেবেন।
"শেষ "
|










Comments
Post a Comment